বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ১০:৫৩ পূর্বাহ্ন
অগ্রণী ব্যাংকের ভেতরে ভেতরে কোটি টাকার গোপন খেলা!
অনলাইন ডেস্ক
রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম একপ্রকার কব্জা করে নিয়েছিল তৃতীয় পক্ষ—‘দুয়ার সার্ভিসেস লিমিটেড’ নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। সরকারের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা তুলে নেওয়ার পথ খুলে দেওয়া হয়। অথচ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদনের আগেই ‘দুয়ার’-এর সঙ্গে গোপনে চুক্তি করে অগ্রণী ব্যাংক। জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটি ছিল সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের পরিবারের ঘনিষ্ঠদের মালিকানাধীন। ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়কালেই অগ্রণী ব্যাংকের বোর্ড এই সুবিধা দিয়েছিল। এতে দুয়ারের ভাগ্য খুলে গেলেও, রাষ্ট্রীয় এই ব্যাংক পড়েছে বিশাল লোকসানে। যদিও এখন চুক্তি বাতিল করেছে নতুন বোর্ড। এসব তথ্য উঠে এসেছে অগ্রণী ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক গোপন প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, অগ্রণী ব্যাংকের স্বার্থবিরোধী নানা সিদ্ধান্তে দুয়ার সরাসরি লাভবান হয়েছে। ২৫০ কোটিরও বেশি অপচয় হয়েছে ব্যাংকের তহবিল থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সুস্পষ্ট নির্দেশনা উপেক্ষা করে অনুমোদনের আগেই চুক্তি, তৃতীয় পক্ষের সফটওয়্যার ব্যবহার, অতিরিক্ত বিল পরিশোধসহ নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়ে দুয়ার। এসব অভিযোগ উঠে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অগ্রণী ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্তে। তবুও, দুয়ার আবারও নতুন চুক্তির জন্য চাপ সৃষ্টি করছিল; তবে ব্যাংকের নতুন শর্ত মানতে না পারায় ২০ জুন থেকে তাদের কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
২০১৩ সালে অগ্রণী ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু করলেও আনুষ্ঠানিক অনুমোদন মেলে ২০১৫ সালের ২৬ অক্টোবর। অথচ ওই বছরের মে মাসেই দুয়ারের সঙ্গে গোপনে চুক্তি সেরে ফেলে কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই চুক্তির তারিখ নির্দিষ্ট না থাকলেও এটি অনুমোদনের আগেই করা হয়েছিল। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন জাগে তখন, যখন দেখা যায়—তিন বছর ধরে সেই অনুমোদনপত্র গোপন রাখা হয় এবং ২০১৮ সালে প্রকাশ পায়। এমনকি ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে পরিচালনা পর্ষদে বিষয়টি আলোচনা হলেও কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে বরং দুয়ারকে আর্থিকভাবে আরও সুযোগ দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে একে বলা হয় “উইন্ডো ড্রেসিং”—অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা ঢেকে বাহ্যিক শৃঙ্খলা দেখানোর অপচেষ্টা।
প্রায় ১১ বছর ধরে চলা কার্যক্রমে দুয়ার পেয়েছে ২২৭ কোটি টাকার বিল। শুধু সফটওয়্যার নয়—স্টেশনারি, আসবাব, কম্পিউটারসামগ্রী এবং এজেন্ট পয়েন্টের নামে বিশাল অঙ্কের অর্থ লুট হয়েছে। ৫৬৭ জন সিএসপিকে ৯০ হাজার টাকা করে এককালীন অর্থ দেওয়া হয়। প্রযুক্তিসেবার নামে মাসে ৫৩ লাখ, আবার কখনও ৩৪ লাখ, সফটওয়্যার সাপোর্টে ১৩ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে ব্যাংক। অথচ এসব ব্যয়ের কোনো খাত ছিল না চুক্তিপত্রে। সবই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম লঙ্ঘন করে করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট জানায়—ব্যাংকের নিজস্ব সফটওয়্যারের বদলে ‘সেলোস্কোপ’ নামে দুয়ারের সফটওয়্যার ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যাংক একটি বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করে। প্রতি মাসে ১ কোটি ১ লাখ টাকা বিল পরিশোধের পাশাপাশি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সলিউশনে তৃতীয় পক্ষের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ থাকলেও, সেই নিষেধাজ্ঞাও লঙ্ঘন করেছে অগ্রণী ব্যাংক। এই অনিয়মের জন্য ২০২৩ সালের ৩১ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি চিঠি দিয়ে দায়ী কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে বলে। এমনকি ডাটা সেন্টার ব্যাংকের নিজস্ব ভবনে স্থাপন করেও দুয়ারকে ১ লাখ ৭ হাজার টাকা মাসিক ভাড়া দিয়েছে ব্যাংক, যা আইন বহির্ভূত।
অভ্যন্তরীণ তদন্তে আরও উঠে এসেছে—দুয়ারের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল ব্যাংকের কিছু সাবেক ক্ষমতাধর কর্মকর্তা। নিজেদের আত্মীয়স্বজনকে এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ দিয়ে, আশপাশের শাখার গ্রাহকদের সরিয়ে নিয়ে আসতেন এসব এজেন্ট পয়েন্টে। ফলাফল—ব্যাংকের মূল শাখাগুলোর আয় কমে যায়, লোকসান বাড়ে। অভিযোগ রয়েছে, ইচ্ছাকৃতভাবে লেনদেন সরিয়ে লোকসান দেখানো হতো।
অভিযোগ আরও গভীর হয়েছে, যখন তদন্তে উঠে আসে—প্রায় ৬ কোটি টাকা আত্মসাৎ হয়েছে দুয়ারের কিছু এজেন্ট পয়েন্ট থেকে। এই অনিয়মের প্রেক্ষিতে ১৯ জুন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ব্যাংক কিছু শর্ত দিয়েছিল; কিন্তু দুয়ার মানেনি। ফলে ২২ জুন থেকে ৫৬৭টি এজেন্ট পয়েন্টের সব কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। এখন থেকে গ্রাহকরা অগ্রণী ব্যাংকের যেকোনো শাখা থেকে আগের মতোই সেবা পাবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২১ ও ২০২২ সালের দুটি পরিদর্শন প্রতিবেদনে অতিরিক্ত অর্থ প্রদান ও চুক্তিভঙ্গের বিষয়গুলো তুলে ধরে। ২০২৩ সালের ৬ আগস্ট ব্যাংকের এমডির কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। উত্তর না পাওয়ায় ফের ৩১ আগস্ট তাগাদা পাঠানো হয়। ব্যাংক পরে জানায়, তারা একটি নিরপেক্ষ নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিষয়টি দেখবে। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভিযোগ—নিরীক্ষায় এখনো খাতওয়ারি বিশ্লেষণ, অতিরিক্ত অর্থ ফেরত আনা বা দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনা নেই। যদিও ব্যাংকের নতুন বোর্ড কিছু শর্ত দিয়েছিল, তা মানতে অস্বীকৃতি জানায় দুয়ার।
অগ্রণী ব্যাংক জানিয়েছে, তারা ইতিমধ্যে নিজস্ব সফটওয়্যার তৈরি করেছে এবং শিগগিরই এজেন্ট ব্যাংকিং আবার চালু করবে। ভবিষ্যতে আর কোনো তৃতীয় পক্ষের উপর নির্ভর করা হবে না বলে জানিয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
কর্তৃপক্ষের ভাষ্য:
দুয়ারের অনিয়ম নিয়ে জানতে চাইলে ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, “পূর্ববর্তী বোর্ডের আমলে দুয়ার ভয়াবহ অনিয়ম করেছে। তদন্তে প্রমাণও মিলেছে। আমরা নতুন বোর্ড হিসেবে এসব বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি।”
ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ারুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, “দুয়ারের এজেন্টদের অনেকেই ছিলেন আমাদের সাবেক কর্মকর্তা। তাদের প্রভাবেই শাখাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমরা আর এই অবস্থা মেনে নিচ্ছি না।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের মন্তব্য:
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান গণমাধ্যমকে বলেন, “দুয়ারের সঙ্গে চুক্তি নবায়ন না করা একান্তই ব্যাংকের সিদ্ধান্ত। তবে তাদের পূর্ববর্তী পদ্ধতি সঠিক ছিল না, তা আমাদের একাধিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। আশা করি, অগ্রণী ব্যাংক নিজস্ব সক্ষমতায় কার্যক্রম সফলভাবে চালিয়ে যাবে।”